বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ( চাকমা, গারো, মারমা, সাঁওতাল ও রাখাইনদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য)

দীর্ঘকাল ধোরে বাংলাদেশে বেশ কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করছে। বাংলাদেশের  নৃগোষ্ঠী সমূহ যথাক্রমে চাকমা, সাঁওতাল, গারো, রাখাইন,  মারমা, ম্রো, ত্রিপুরা, বম, অঞ্চঙ্গ্যা, চাক, খ্যাং, পাংখুয়া,লুসাই, খুমি,খাসি, মনিপুরি,ওরাঁও, মাহালি মুন্ডা, মালো,  মাল পাহাড়ি, ডালু,পাত্র,হদি বর্মণ, বাজবংশী,পাহান,বানাই,কোল,মাহাতো ইত্যাদি নৃ-গোষ্ঠী। 

⚫ বাংলাদেশের  ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভৌগোলিক অবস্থান :

ভৌগোলিক অবস্থান ভেদে দুই প্রকারের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ আছে। যথাঃ ১. পাহাড়ি ও ২. সমতলবাসী।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের ( চট্টগ্রাম, রাঙামাটি,বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) জেলায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গুলো হলোঃ মারমা,চাকমা,ত্রিপুরা, বম,ম্রো,তঞ্চঙ্গ্যা, পাংখুয়া, চাক,খ্যাং খুমি এবং লুসাই। নৃতাত্ত্বিক বিচারে  মঙ্গোলীয় নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ এরা।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশের ( দিনাজপুর, রাজশাহী, রংপুর, পাবনা ও বগুড়া)  জেলার নৃ-গোষ্ঠী সমূহ হচ্ছেঃ সাঁওতাল,ওরাঁও, মালো,মাহালি মুন্ডা, মাল পাহাড়ি ইত্যাদি নৃ-গোষ্ঠী। এরা সাধারণত সমতল বাসী হিসেবে পরিচিত।

⚫  বাংলাদেশের   নৃ-গোষ্ঠীর পরিচয় ⚫ 

♦️ চাকমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ♦️

▪️অবস্থানঃ রাঙামাটি, বান্দরবান,  খাগড়াছড়ি জেলায়। এছাড়াও চাকমারা ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং অরুণাচলে বসবাস করে।

▪️ চাকমাদের সামাজিক জীবন : চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক।অর্থাৎ পিতাই পরিবারের প্রধান। কিছু চাকমা পরিবার নিয়ে গঠিত হয় পাড়া বা আদম। পাড়ার প্রধান কে বলে কার্বারি। কয়েকটি পাড়া নিয়ে গঠিত হয় মৌজা।  মৌজার প্রধানকে বলা হয় হেডম্যান। কয়েকটি মৌজা মিলে চাকমা সার্কেল গঠিত হয়। চাকমা সার্কেলের  প্রধান হলেন চাকমা রাজা।  এই রাজার পদটি বংশানুক্রমিক। 

▪️চাকমাদের অর্থনৈতিক জীবন : চাকমারা প্রধানত কৃষিকাজ করে  জীবিকা নির্বাহ করে। এরা জুম পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে।

▪️চাকমাদের ধর্মীয় জীবন :  চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। চাকমাদের অধিকাংশ গ্রামের কিয়াং বা বৌদ্ধ মন্দির আছে। বৈশাখী পূর্নিমা  চাকমাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব।  চাকমারা মাঘী পূর্নিমার রাতে কিয়াং প্রাঙ্গনে গৌতম বুদ্ধের সম্মানে ফানুস উড়ায়। চাকমা সমাজে মৃত দেহ পোড়ানো হয়। 


▪️চাকমাদের সাংস্কৃতিক জীবন :

# চাকমাদের পোশাক : চাকমা পুরুষের বর্তমানে শার্ট প্যান্ট ও লুংগি পরিধান করলেও পূর্বে তারা মোটা সুতার জামা, ধুতি ও গামছা পরিধান করতো।তারা মাথায় পাগড়ি বাধতো। চাকমা মেয়েদের পরনের কাপড়ের না হাদি এবং পিনোন।                     


  #ব্যবহৃত জিনিস পত্রঃ তারা বেত ও বাঁশ দিয়ে অনেক জিনিস বানায়। যেমন: চিরুনি, পাখা,  ঝুড়ি, বাঁশি ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র।              #  চাকমাদের খাদ্যাভ্যাস :  আমাদের মত চাকমাদের প্রধান খাদ্য ভাত। ভাতের সাথে শাকসবজি ও মাছ মাংস খায়। তবে চাকমাদের প্রিয় খাদ্য বাঁশ কোড়ল।   #খেলাধুলাঃ চাকমাদের অন্যতম খেলা ধুলা হচ্ছে হা-ডু-ডু, কুস্তি,  ঘিলাখারা ও বউচি।            #তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্ববৃহৎ উৎসব বিজু।৷                                                              #চাকমাদের নিজস্ব ভাষা আছে।


♦️  গারোদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য  ♦️

গারোরা মান্দি নামে নিজেদের পরিচয় দিতে পছন্দ করে।গারোরা মঙ্গোলীয় নৃ-গোষ্ঠীর লোক।

▪️ গারোদের অবস্থান : বাংলাদেশের ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইলের মধুপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, সিলেট, জামালপুর ও গাজীপুরের শ্রীপুরে বাস করে। এছাড়াও ভারতের মেঘালয় ও অন্যান্য রাজ্যও বসবাস করে।

▪️গারোদের সামাজিক জীবন : গারো সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। অর্থাৎ মা পরিবারের প্রধান এবং সন্তানেরা মায়ের উপাধি ধারণ করে।  এবং পুরুষ মানুষ  সংসার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে থাকে।গারো সমাজে কয়েকটি দল রয়েছে। প্রধান ৫ টি দল হচ্ছে সাংমা, মারাক, মোমিন,শিরা এবং আরেং।

▪️গারোদের  অর্থনৈতিক জীবন : প্রধান পেশা  কৃষি। তারা হাল চাষের মাধ্যমে ধান, আনারস ও নানা রকমের সবজি চাষ করে থাকে।

▪️ গারোদের ধর্মীয় জীবন : গারোদের আদি ধর্মের নাম সাংসারেক। তাদের প্রধান দেবতা ছিল তাতারা রাবুগা। তবে বর্তমানে গারোদের অধিকাংশ লোক খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী। 

▪️গারোদের সাংস্কৃতিক জীবন :

# গারোদের পোশাক : গারো পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক হচ্ছে গান্দো। নারীদের নিজেদের তৈরি পোশাকের নাম দকমান্দা ও দকশাড়ী। 

# গারোদের খাদ্য : গারোরা ভাতের সাথে মাছ ও শাকসবজি খায়। মেওয়া গারোদের জনপ্রিয় খাদ্য। এরা বিভিন্ন পিঠা খেতে পছন্দ করে।  যেমনঃ কোলা পাতা মোড়ানো পিঠা, মেরা পিঠা,  তেলের পিঠা।

# গারোদের প্রধান সামাজিক ও কৃষি উৎসব হলো ওয়ানগালা।    # গারোদের ভাষা আচিক। এই গারো ভাষা তিব্বতীয়-বর্মি ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। 


♦️ সাঁওতালদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য  ♦️

সাঁওতালরা অস্ট্রালয়েড নৃ-গোষ্ঠী  ভুক্ত। সাঁওতালদের গায়ের রঙ কালো, উচ্চতা মাঝারি,চুল কালো ও ঈষৎ ঢেউ খেলানো। 

▪️ সাঁওতালদের অবস্থান :  সাঁওতালরা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশের  জেলা তথা রাজশাহী,  রংপুর,  দিনাজপুর ও বগুড়া জেলায়  বসবাস করে।  ধারণা করা হয় বাংলাদেশে বসবাসরত সাঁওতালদের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ  ও বিহার এবং অন্যান্য অঞ্চলে

 ▪️ সাঁওতালদের সামাজিক জীবন : সাঁওতালরা  পিতৃতান্ত্রিক।  সাঁওতালদের সমাজের মূল ভিত্তি গ্রাম পঞ্চায়েত।  তাদের এই গ্রামের পঞ্চায়েত পরিচালনা করার জন্য মাঞ্জহি হারাম, জগমাঞ্জহি,  জগপরামাণিক,  গ্রাডেৎ ও নায়কি এই পাঁচ জন সদস্য থাকে।

▪️সাঁওতালদের  সামাজিক  জীবন : সাঁওতালরা প্রধানত  কৃষক।  পুরুষ ও মহিলা উভয়ই খেতে কৃষি কাজ করে থাকে। সাঁওতালরা ধান,  তামাক, সরিষা,  মরিচ, ইক্ষু, তিল প্রভৃতি চাষ করে।  তারা বেত, বাঁশ,  শালপাতা দিয়ে মাদুর,  ঝাড়ু, প্রভৃতি জিনিস পত্র তৈরি  করে।

▪️সাঁওতালদের ধর্মীয় জীবন  : তারা প্রধানত দুইটা ধর্মের অনুসারী।  যথাঃ সনাতন ও খ্রিস্টান। 

▪️সাঁওতালদের সাংস্কৃতিক জীবন : সাঁওতালদের প্রধান খাবার ভাত। তাদের ঘরের দেওয়াল মাটির তৈরি এবং খড়ের ছাউনি৷ সোহরাই ও বাহা তাদের উল্লেখযোগ্য উৎসব।  তাদের বিবাহ অনুষ্ঠানে দোন ও ঝিকা নাচের আয়োজন করা হয়।

▪️ সাঁওতালদের পোশাক : পুরুষেরা লুঙ্গি ও মেয়েরা শাড়ি পরে। তারা অলংকার প্রিয়। পুরুষেরা গলায় মালা ও হাতে বালা এবং মেয়েরা হাতে ও গলায় কাঁসা বা পিতলের গয়না পরে। 

♦️ মারমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ♦️

মারমা শব্দ টি ম্রাইমা শব্দ থেকে উদ্ভুত।  জনগণের দিক দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গুলোর মধ্যে মারমাদের অবস্থান দ্বিতীয়।  তারা বান্দরবান,  রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাস করে। 

 ▪️মারমাদের সামাজিক জীবনঃ বোমাং সার্কেলে অন্তর্ভুক্ত মারমা সমাজের প্রধান হলেন বোমাং চিফ বা বোমাং রাজা।  মারমাদের গ্রাম কে তারা তাদের ভাষায় রোয়া ও গ্রামের প্রধান কে রোয়াজা বলে।

▪️ মারমাদের অর্থনৈতিক জীবন : মারমারা সাধারণত কৃষক এবং জুম পদ্ধতি তে চাষাবাদ করে।

▪️ মারমাদের ধর্মীয় জীবন : মারমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।  তাদের প্রায় প্রত্যেকটি গ্রামে বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধ ভিক্ষু দেখা যায়। তারা আশ্বিনী পূর্নিমা, বৈশাখী পূর্নিমা, কার্তিকী পূর্নিমা,  মাঘী পূর্নিমা পালন করে।

▪️মারমাদের খাদ্য ও বাসস্থান : মারমারা ভাত,  মাছ, মাংস,  ও নানা প্রকারে শাকসবজি খায়। তাদের ঘর বাঁশ,  কাঠ ও ছন দ্বারা তৈরি করে। 

▪️মারমাদের পোশাক  : মারমা মহিলা রা কাপড় বোনা কাজে খুবই দক্ষ। পুরুষেরা জামা, লুংগি ও গবং পরিধান করে।মারমা মেয়েরা ব্লাউজ পরে তার নাম আঞ্জি। এছাড়া তারা থামি পরে।

▪️মারমাদের সংস্কৃতি :  মারমারা পুরাতন পুরাতন বর্ষকে বিদায় ও নতুন বর্ষকে বরণ উপলক্ষে সাংগ্রাই উৎসব পালন করে। এই সময় তারা পানি খেলা বা জলোৎসব এ মেতে ওঠে।

♦️ রাখাইনদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ♦️ 

রাখাইন শব্দ টি রাক্ষাইন থেকে উৎপত্তি। রাখাইনরা রাক্ষাইন নামে পরিচয় দিতে ভালোবাসে।  রাখাইনরা মঙ্গোলীয় নৃ-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। রাখাইনরা পিতৃতান্ত্রিক। 

▪️রাখাইনদের বাসস্থান  : রাখাইনদের আদিনিবাস মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে।  বাংলাদেশের বরগুনা,  পটুয়াখালী ও কক্সবাজারে বসবাস করে।

▪️ রাখাইনদের অর্থনৈতিক জীবন  : তারা প্রধানত কৃষি নির্ভর । তবে তারা হস্তচালিত তাঁত থেকে কাপড় বোনে।

▪️রাখাইনদের পোশাক : রাখাইন পুরুষেরা লুংগি ও ফতুয়া পরে। বিভিন্ন লোকজ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পাগড়ি মাথায় দেয়। মেয়েরা লুংগি ও ব্লাউজ পরিধান করে। 

▪️রাখাইনদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন : রাখাইনরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।  রাখাইনদের প্রধান প্রধান উৎসব হচ্ছে গৌতম বুদ্ধের জন্ম-বার্ষিকী, বৈশাখী পূর্নিমা ও বসন্ত উৎসব। 

▪️তথ্য সংগ্রহ : Bangladesh & Global Studies Book

Arup

hi, I am ARUP SARDAR. I am a student at university of Barishal. My Department is Geology and Mining.

Post a Comment

Previous Post Next Post