⚫ভূমিকম্পের কারণ, ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয়⚫
প্রাকৃতিক দুর্যোগ গুলোর মধ্যে ভূমিকম্প অন্যতম। পৃথিবীর ইতিহাসে পৃথিবীর অনেক ধ্বংসলীলার কারণ হিসাবে ভূমিকম্প কে দায়ী করা হয়। ভূপৃষ্ঠে সংঘটিত আকস্মিক ও ক্ষণস্থায়ী কম্পনকে ভূমিকম্প বলা হয়। ভূমিকম্প সাধারণত কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়। এই কম্পন অত্যন্ত মৃদু থেকে প্রচন্ড হয়ে থাকে। ভূমিকম্পের পূর্বে সতর্কতার সংকেত দেওয়া সম্ভব হয় না। তার জন্য ধ্বংসলীলা ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।
## পৃথিবীর অভ্যন্তরের যে স্থানে ভূমিকম্প উৎপত্তি হয় তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র বলা হয়।
## ভূমিকম্পের কেন্দ্রের ঠিক সোজাসুজি উপরের ভূপৃষ্ঠ কে উপকেন্দ্র বলা হয়।
উপকেন্দ্রে ভূমিকম্পের প্রথম ঝাকি অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের বেগ উপকেন্দ্র হতে ধীরে ধীরে চারিদিকে কমে যায়।
▪️কেন্দ্রের গভীরতার ভিত্তিতে ভূমিকম্পের কেন্দ্রকে প্রধানত ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। যথাঃ ক. অগভীর কেন্দ্র, খ. মাঝারি কেন্দ্র , গ. গভীর কেন্দ্র।
🔻অগভীর কেন্দ্রঃ
ভূমিকম্পের কেন্দ্র যদি পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ৭০ কিলোমিটার অভ্যন্তরের মধ্যে হয় তাকে অগভীর কেন্দ্র হিসাবে অভিহিত করা হয়।
🔻 মাঝারি কেন্দ্রঃ
ভূমিকম্পের কেন্দ্র যদি ৭০ কিলোমিটার থেকে ৩০০ কিলোমিটারের মধ্যে হলে তাকে মাঝারি কেন্দ্র হিসাবে অভিহিত করা হয়।
🔻 গভীর কেন্দ্রঃ
ভূমিকম্পের কেন্দ্র ৩০০ কিলোমিটারের বেশি অভ্যন্তরে হলে তাকে গভীর কেন্দ্র হিসাবে অভিহিত করা হয়।
♦️ ভূমিকম্পের কারণঃ
▪️ পৃথিবীর যে সমস্ত এলাকায় নবীন পর্বতমালা অবস্থিত সেই সকল জায়গায় ভূমিকম্প বেশি হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ভিত্তি শিলা বা ফাটল বরাবর আকস্মিক ভাবে ভূ-আলোড়ন হলে ভূমিকম্প হয়।
▪️ পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে আগ্নেয়গিরির লাভা প্রচন্ড শক্তিতে বের হয়ে আসার সময় ও ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
▪️ তাপ বিকিরণ করে ভূত্বক সংকুচিত হলে ভূমির নিচের শিলাস্তরে ভারের সামঞ্জস্য ঠিক রাখতে ফাটল ও ভাজের সৃষ্টির ফলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
▪️ পাশাপাশি অবস্থানরত দুটি প্লেটের একটি অপরটির সীমানা বরাবর তলদেশে ঢুকে পড়ে অথবা অনুভূমিক ভাবে আগে পিছে সরে যায় এমন সংঘাত পূর্ণ পরিবেশে ভূমিকম্প সংঘটিত হয়।
▪️ ভূত্বকের নিচে ম্যাগমা সঞ্চারণ কিম্বা চ্যুতি রেখা বরাবর চাপমুক্ত হওয়ার কারণে ভূমিকম্প হয়ে থাকে।
সুতরাং বলা যায় যে, ভূমিকম্পের প্রধান প্রধান কারণ সমূহ হলোঃ ভিত্তিশিলা চ্যুতি বা ফাটল, ভূ-পাত, তাপ বিকিরণ, ভূ-গর্ভস্থ বাষ্প, আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, ভূ-গর্ভস্থ চাপের হ্রাস, হিমবাহের প্রভাব ও ভূ-পৃষ্ঠের চাপ বৃদ্ধি ইত্যাদি।
♦️ বিশ্বের ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলঃ
পৃথিবীর সব জায়গায় ভূমিকম্পের প্রকোপ সমান নয়। বিশ্বের ধ্বংসাত্মক প্রায় সকল ভূমিকম্প পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল / বলয়ে উদ্ভুত হতে দেখা যায়। এই এলাকা গুলোকে সাধারণত ৩টি প্রধান অংশে ভাগ করা যায়। যেমনঃ ক. প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, খ. ভূ-মধ্যসাগরীয় হিমালয় অংশ, গ. মধ্য আটলান্টিক - ভারত মহাসাগরীয় শৈলশিরা অংশ।
🔻 প্রশান্ত মহাসাগরীয় অংশঃ
প্রশান্ত মহাসাগরের বহিঃসীমানা বরাবর ভূমিকম্প সবচেয়ে বেশি হয়। অ্যালিসিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, জাপান, চিলি, ফিলিপাইন, আলাস্কা সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা। জাপান কে ভূমিকম্পের দেশ বলা হয়।
🔻 ভূ-মধ্যসাগরীয় - হিমালয় অংশঃ
এই অংশ আল্পস পর্বত থেকে শুরু করে ভূ-মধ্যসাগরের উত্তর তীর হয়ে ককেশাস, হিমালয়, ইরান, ইন্দোচীন ও পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ হয়ে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত।
🔻 মধ্য আটলান্টিক - ভারত মহাসাগরীয় শৈলশিরাঃ
উত্তর - দক্ষিণ বরাবর মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরা এবং ভারত মহাসাগরীয় শৈলশিরা মিশে আফ্রিকার লোহিত সাগর বরাবর ভূ- মধ্যসাগরীয় অংশের সাথে মিলেছে।
♦️ বাংলাদেশে ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা:
বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্প বলয়ে অবস্থিত। বাংলাদেশে প্রধানত ভূমিকম্প হয় গঠনগত কারণে। ইউরেশিয়ান প্লেট, ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মা প্লেটের মাঝামাঝি হওয়ায় বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকি প্রবণ এলাকায় অবস্থিত। সাধারণত টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে বাংলাদেশে ভূমিকম্প হয়। এছাড়াও পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ার কারণে ও কিছু কিছু স্থান প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারাতে বসেছে।
১৯৮৯ সালে ফরাসি ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম বাংলাদেশের ভূমিকম্প বলয় সম্বলিত মানচিত্র তৈরি করেন। বাংলাদেশকে ৩ টি ভূকম্প বলয়ে বিভক্ত করা হয়। ১ম বলয় কে প্রলয়ঙ্কারী, ২য় বলয়কে বিপজ্জনক ও ৩য় বলয়কে লঘু বলে বর্ননা করেছেন। এই বলয় সমূহকে বলা হয় সিসমিক রিক্স জোন। রংপুর, মময়মনসিংহ, সিলেট এর শহর এলাকা বলয়-১ ভুক্ত, এই জায়গায় ভূমিকম্পের সর্বোচ্চ কম্পন, রিখটার স্কেলে তীব্রতার মাত্রা-৭। ভূমিকম্প বলয়-২ এর আওতায় রয়েছে দিনাজপুর, বগুড়া, ঢাকা ও চট্টগ্রামের শহর এলাকা সমূহ এবং কম্পন মাত্রা রিখটার স্কেলে -৬ এবং দেশের অন্যান্য যে সকল অঞ্চলে তীব্রতার মাত্রা ৫ অতিক্রম করে না। এই সকল অঞ্চল ভূমিকম্প বলয়-৩ এর অন্তর্ভুক্ত।
🔻 ভূমিকম্পের প্রস্তুতি স্বরূপ করনীয়ঃ
▪️ বাড়িতে টর্চ বাতি, লোহা কাটা করাত, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম সব সময় রাখা।
▪ বাড়ির গ্যাস, পানি, ও বিদ্যুৎ এর মেইন সুইচ কোথায় এবং কিভাবে বন্ধ করতে হয় তা পরিবারের সকলের শিখে রাখা প্রয়োজন।
▪️বাড়ির সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গা টি চিহ্নিত করা।
▪️ হাসপাতাল, অ্যামবুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের ফোন নাম্বার সাথে রাখা।
🔻ভূমিকম্প চলাকালীন সময়ে করণীয়ঃ
▪️ বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। গ্যাসের চুলা বন্ধ করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি থেকে বের হয়ে ফাঁকা জায়গা অবস্থান নিতে হবে।
▪️বাড়ি থেকে বের হওয়া সম্ভব না হলে টেবিল / খাটের নিচে ঢুকে থাকতে হবে। কাচের জানালা থেকে দূরে থাকতে হবে।
▪ভূমিকম্পের সময় রাস্তার উপর গাড়িতে থাকলে, গাড়ি না চালিয়ে বন্ধ রাখতে হবে।
▪️ সিনেমা হল, মার্কেট, শপিংমলে থাকলে এতদাঞ্চলে আকস্মিক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হতে পারে এবং আগুন ও লাগার সম্ভাবনা থাকে। তাই এ ক্ষেত্রে প্রথমে নিচু হয়ে বসে বা শুয়ে থাকা শ্রেয় এবং পরবর্তীতে দ্রুত স্থান ত্যাগ করা।
▪️ঘরের বাইরে থাকলে দালান, বড় গাছ, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইন থেকে দূরে থাকতে হবে। খোলা মাঠে দাঁড়ানো সব থেকে ভালো।
পোস্ট লিখেছেনঃ ARUP SARDAR
